
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক বাস্তবতা ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ জমা পড়লেও তা কবে এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই গত ২১ জানুয়ারি নবম জাতীয় বেতন কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়। কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের কমিশন বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে।
প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ ধাপের নতুন বেতন স্কেলের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পেনশন, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাও প্রায় সমান হারে বাড়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে কমিশনের প্রতিবেদনে বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরেই তৈরি হয়েছে মতভেদ। কয়েকজন উপদেষ্টার মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বড় পরিসরে বাড়ানো বৈষম্য তৈরি করতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের সীমিত আয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।
এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠকে বাস্তবায়নের সম্ভাব্য দিক, আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করা হয়।
এদিকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এখনো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। তিনি বলেন, কমিটি গঠিত হলে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে বেতন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি।
উপদেষ্টা পরিষদের ওই বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠনের আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা গঠন হয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে কমিশনের সুপারিশ জমা পড়লেও বাস্তবায়নের পথ এখনো স্পষ্ট নয়। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করছে সরকারি কর্মচারীদের কাঙ্ক্ষিত নতুন বেতন কাঠামোর ভবিষ্যৎ।/ দৈনিক জনকণ্ঠ/