
প্রাথমিকের বদলি যেন সোনার হরিণ। বছরের পর বছর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বদলি হয় না। অনলাইনে বদলি প্রক্রিয়া আছে, তবে তা জটিলতায় ভরা। এ পদ্ধতিতে শিক্ষকদের সন্তুষ্টি শূন্যের কোঠায়। উল্টো অভিযোগ রয়েছে, অনলাইনে বদলি প্রক্রিয়ায় কারিগরি হস্তক্ষেপ হয়। সফটওয়্যারভিত্তিক হওয়ায় তা নিয়ে জোর প্রমাণ নেই। কিন্তু অন্তবর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রাথমিকের ৯০ জন সহকারী শিক্ষক বদলির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিযোগ উঠেছে, আমলাদের একটি অংশ প্রভাব বিস্তার করে এই বদলিতে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সর্বশেষ টাকার বিনিময়ে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পর এটি জিও (আদেশ) আকারে জারি করা হবে। আর এই বদলির পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক আমলা। জনকণ্ঠের হাতে এই বদলি সংক্রান্ত গোপনীয় নথি রয়েছে। এতে এই ৯০ শিক্ষকের বদলি ও সংযুক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। আর এই তদবিরে মন্ত্রণালয়ের আমলা পর্যায়ের একাধিক রেফারেন্সও ব্যবহার করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, এটি যদি বাস্তব হয় তবে বদলি বাণিজ্যের একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। সংযুক্তিতে শতাধিক বদলি চরম অন্যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জনকণ্ঠের হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, বরিশাল হিজলার টুমলক্ষীপুর (আমিনুল হক) সপ্রাবির তানজীন তামান্নাকে ঢাকা মোহাম্মদপুর থানার আগারগাঁও তালতলা সপ্রাবিতে বদলি করা হচ্ছে। এ জন্য সরকারের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। একই ভাবে সাতক্ষীরা কালিগঞ্জের পশ্চিম মৌতলা সপ্রাবির রেবেকা সুলতানাকে খুলনা সররের মোল্লাপাড়া বিদ্যালয়ে বদলি করা হবে। মিরপুর পীরেরবাগ সরকারি প্রাথমিকের আগমনী মালাকারকে ঢাকার আগারগাঁও তালতলা বিদ্যালয়ে সংযুক্তি দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের রাউজানের মনীষা খাস্তগীরকে চট্টগ্রামের অন্দরকিয়াতে বদলি, ঢাকার রমনার একটি বিদ্যালয় থেকে সাদিয়া নূরকে ঢাকার খিলগাঁওয়ে, সিরাজগঞ্জ থেকে মো. নুরুল আলমকে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বদলি করা হবে। ময়মনসিংহরে ইশ্বরগঞ্জ থেকে জাকিয়া সুলতানাকে জেলার সদলে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের হরুন নেছাকে উত্তর বাড্ডার একটি স্কুলে, কুমিল্লার কুসুম কলিকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে সংযুক্ততে, পঞ্চগড়ের আফসানা পারভীনকে দিনাজপুরে বদলি ও বগুড়ার ধুনটে (বর্তমানে ক্যান্টনমেন্ট ঢাকায় সংযুক্তিকে আছেন সারিয়া বাশার মিমকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বদলির করা হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়মবহির্ভূত বদলির উদ্যোগ নিচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। একসঙ্গে এত শিক্ষককে নির্বাহী আদেশ,বদলিপ্রত্যাশীদের মনে ব্যপক ক্ষোভের সঞ্চার করবে। কারণ দিনের পর দিন লাখ লাখ টাকা নিয়েও মানুষ তার প্রিয় কর্মস্থলে বদলি করতে পারছে না।
বদলি কার্যক্রমের আদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) জারি করে থাকলেও এর বিষয়ে দপ্তরটির মহাপরিচালক আবু নূর মোঃ শামসুজ্জামান এই বদলির বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জনকণ্ঠকে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমলারা চাইলে দুই একজনকে হস্তক্ষেপ করে অন্তভুক্ত করার সুযোগ থাকে। কিন্তু এমন শতাধিক বদলি তার দপ্তর থেকে হয়নি।
এদিকে একাধিক শিক্ষক ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, অনলাইন বদলির নির্দেশ হাতে পেলেও হাজারো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে পারছেন না। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে জেলায় জেলায় অনলাইনের মাধ্যমে দেওয়া প্রায় হাজারো প্রতিস্থাপন শর্তযুক্ত বদলির আদেশ কাগজেই থেমে আছে। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলাতেই প্রায় ৬০ জন শিক্ষক একই সমস্যায় আটকে আছেন। হবিগঞ্জে ৪৬ জনের মধ্যে ২১ জন, সিলেটে ৬৪ জনের মধ্যে ২৫ জন, মৌলভীবাজারে ৬০ জনের মধ্যে ২২ জন, চট্টগ্রামে ৭৩ জনের মধ্যে ১১ জন, রংপুরে ৫৯ জনের মধ্যে ১৭ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৫৯ জনের মধ্যে ১৭ জনসহ বিভিন্ন জেলায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষক বদলির আদেশ পেয়েও নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি বলে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা যায়, নারায়নগঞ্জ সদরের শারমিন আক্তারকে ঢাকার গুলশানের একটি স্কুলে বদলি করা হবে। মিরপুর ঢাকায় সংযুক্তিতে আছেন ফারজানা সুলতানাকে ধউর সাপ্রবিতে বদলি করা হচ্ছে। কেরানীগঞ্জের তাহমীনা আলীকে ঢাকার ডেমরার একটি স্কুলে সংযুক্তি করার সুপারিশ করা হয়েছে। গাজীপুরের ফারজানা নাসরীনকে গুলশান দক্ষিণখানের একটি স্কুলে সংযুক্তি, পটুয়াখালী থেকে মোসা. আফসানা পিংকিকে বরিশালে সংযুক্তি, জোবায়দা খাতুনকে নাটোরের বড়াইগ্রাম থেকে সদরে সংযুক্তি এবং জামালপুরের সালমা আক্তারকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি স্কুলে সংযুক্তির অনোমদন দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রাম পর্যায়ে বিশেষ করে চর ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষক সল্পতা রয়েছে। এছাড়াও সংযুক্তি সম্পূর্ণ বেআইনী। অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এভাবে শতাধিক শিক্ষককে খুব গোপনে বদলী করছে। যা নজিরবিহীন ও বেআইনী।
বদলির বিষয়ে হস্তক্ষেপ রয়েছে এমন একজন অতিরিক্ত সচিব মাসুদ আখতার খান। সম্প্রতি তিনি পিআরএল এ গিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি এখন মন্ত্রণালয়ে নেই। ৩১ তারিখে পিআরএল এ এসেছি। এ বিষয়ে কোন কিছু বলতে পারবো না।/দৈনিক জনকণ্ঠ