সমতাভিক্তিক সমাজ গঠন প্রক্রিয়ায় সর্বজনের অংশগ্রহণ এক প্রয়োজনীয় বাস্তবতা। উন্নয়ন কাঠামোকে গতিশীল করতে গেলে সমসংখ্যক নারীর অংশ নেয়া এক অপরিহার্য কর্মযোগ। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নারীর সুস্বাস্থ্য আবশ্যিক এক পর্যায়। স্বাস্থ্যই সকল সুখ-উন্নয়নের চাবিকাঠি। সেখানে নারীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ারও নিয়ামক শক্তি। মাতৃত্ব যে কোনো নারীর আশৈশব মানসিক ব্যাকুলতায় শুধু নয় জীবনব্যাপী আরাধ্য সম্পদেরই অনির্বাণ শক্তিময়তা। সঙ্গত কারণে নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন আলোচনা সভাই শুধু নয় বাস্তব প্রেক্ষাপটে তা যথাযথভাবে অনুশীলন, অনুসরণ ও জরুরি।
নারীর স্বাস্থ্যও ক্ষমতায়ন নিয়ে সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় উঠে আসে সর্বংসহা মাতৃত্ব যদি অনিরাপত্তার আবর্তে পড়ে যায় তেমন প্রভাব পড়বে দেশ, সমাজ ও আগামীর নতুন প্রজন্মের উপর। ক্ষীণ স্বাস্থ্য কিংবা অসুস্থ মানসিকতায় মা যেমন বিপন্ন এবং মানসিক অবসাদে ভোগেন তাহলে স্পর্শকাতর প্রজনন স্বাস্থ্যে পড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে ৩০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার এক মতবিনিময় সভায় এমন তাৎপর্যপূর্ণ অভিব্যক্ত বর্ণনা করেন। এই বিজ্ঞ উপদেষ্টা উল্লেখ করেন নারীর প্রতি যতœশীল হওয়াই শুধু ব্যক্তিক কিংবা পারিবারিক নয় গোটা সমাজ ব্যবস্থাই এমন দায়িত্ব পালনে এগিয়ে থাকা ও ন্যায্যতা, যা জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। সবার আগে নারীর স্বাস্থ্য সেবায় সমধিক গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। নারীরা যদি দুর্বল, ক্ষীণ স্বাস্থ্য আর মনিসক বিপন্নতায় ভোগেন তাহলে আগামীর প্রজন্মও একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিশ্চিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে। যেখানে সার্বিক ব্যবস্থাপনাই অনিশ্চয়তার আবর্তে ঢেকে যাবার আশঙ্কা।
আমাদের ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। সমুদ্র পরিবেষ্টিত ও নদী¯œাত এক অবারিত জলসিঞ্চনের মধ্য দিয়ে বিপন্ন সময় পার করে। সেখানে আবার উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও কঠিনতম এক বিষয়। সমুদ্রের নোনা পানিতে গোসল করা নিত্যদিনের কর্মযৈাগ সম্পন্ন করতে যেয়ে প্রতিকূল পরিবেশের শিকার হন উপকূলীয় ও গ্রামীণ নারীরা।
বাংলাদেশ এখনো নদীবিধৌত গ্রাম অঞ্চলের সীমানায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। তার ওপর আছে ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যিক লীলাখেলা। কখনো রৌদ্র উজ্জ্বল তাপদাহে নারীরা ক্ষেতে, খামারে কিংবা খড়ির চুলায় রন্ধন কাজে ব্যস্ত থাকেন। সেখানে জলবায়ু দূষণের মধ্যে পড়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিপন্ন হবার দুঃসহ চিত্র বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসতে সময় নেয় না। উপদেষ্টা আরো উল্লেখ করেন সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যকে যে মাত্রায় দূষণ ও দুর্বল স্বাস্থ্য নিয়ে যায় তাও সমসংখ্যকের সার্বিক শারীরিক মানসিক উভয় দিকেই এক অস্বাস্থ্যকর দুর্বিষহ অবস্থায় ফেলে দিতে সময় নেয় না। সতর্ক সাবধানতায় এমন বিপরীত ¯্রােতকে আটকাতে ব্যর্থ হলে সামনের নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বলয় ও অনিশ্চিত হবার আশঙ্কা বেড়েই যাবে।
ইতোমধ্যে উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবার চিত্র সত্যিই ভাবিয়ে তোলার মতো। এর আশু প্রতিকার করা পরিস্থিতির অপরিহার্যতা। বলা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্বাস্থ্য সেবা যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত।
সেখানে মোবাইল ক্লিনিক বা নৌকা হাসপাতালের মতো আধুনিক উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং কর্মযোগ তৈরি করা পরিস্থিতির ন্যায্যতা।
নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যকে দীর্ঘদিনের অপসংস্কার আর দেশীয় ঐতিহ্যিক ধারায় চালিত করার সুযোগ সময় আর নেই। শিল্প বিপ্লবের পরে যে দূষণ সারা বিশ্বকে আক্রান্ত করেছে সেখানে সর্বাধিক ঝুঁকিতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত কোমল ও স্পর্শকাতর নারী ও শিমু, মাতৃ স্বাস্থ্যের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন থাকে গর্ভের সন্তান আর পরিবারের শিশুরা। সংগত কারণে নারী স্বাস্থ্যে অবহেলা কিংবা নীরবতা মোটেও নয়। বরং প্রজনন স্বাস্থ্য যাতে নিরাপদ এবং নির্বিঘœ থাকে তেমন সচেতনতা, সাবধানতা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা যেন নিয়মিত চালু থাকে তার সুব্যবস্থাও মাতৃত্বের অবিস্মরণীয় শক্তিমত্তাকে স্বচ্ছন্দ এবং সাবলীল ভাবে এগিয়ে দেয়া।
গ্রাম নির্ভর উন্নয়নশীল বাংলাদেশ নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তা আশু প্রতিকার ও সমাধানে প্রয়োজনীয় কর্মপ্রকল্প অবারিত করতে হবে। গ্রামে এখন কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা দৃশ্যমান হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল। সেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোও নিতান্ত দায়বদ্ধতা। আবার যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো প্রজন্ন স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পৌঁছায়নি সেটা ও নজরদারিতে আনতে হবে। যাতে নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় আরও এগিয়ে যাওয়ার চিত্র বাড়ার দিকে চলে আসতে পারে।